দিনাজপুর জেলা ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে যত অভিযোগ!

দিনাজপুর জেলা ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে যত অভিযোগ!

বিগত কয়েক বছর ধরে দিনাজপুর জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি তানভীর ইসলাম রাহুল ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম ইমতিয়াজ ইনানের বিরুদ্ধে টাকা নিয়ে বিতর্কিত ও অনুপ্রবেশকারীদের পদ দেয়াসহ বিভিন্ন অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। অভিযোগ করছেন টাকা দিয়েও পদ না পাওয়া অনেকেই। এদিকে জেলায় পদ পাওয়া অনেকে আলোচনার সময় টাকা দেয়ার কথাও বলছেন। আসলে এই অভিযোগ কতটুকু সত্য?
 
২০১৭ সালের ১৭ অক্টোবর সোহাগ-জাকির কমিটি পরবর্তী এক বছরের জন্য তানভীর ইসলাম রাহুলকে সভাপতি ও গোলাম ইমতিয়াজ ইনানকে সাধারণ সম্পাদক করে দিনাজপুর জেলা ছাত্রলীগের ছয় সদস্যের কমিটির অনুমোদন দেন। কমিটি হওয়ার পর থেকে অদ্যাবধি দুই বছর এক মাস সময়েও জেলার পূর্ণাঙ্গ কমিটি ও উপজেলাগুলোর কমিটি দিতে পারেননি রাহুল-ইনান।
 
তবে, জেলার ১৩টি উপজেলার মধ্যে দুটি উপজেলায় যে তিনটি কমিটির অনুমোদন দিয়েছেন তারা, তাতে অর্থ বাণিজ্যসহ বড় বেশ কিছু অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। এছাড়া, গত দুই বছর এক মাসে তারা জেলায় কোনো দলীয় কর্মসূচি পালন করতে পারেননি বলেও জানিয়েছে স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা।
 
উক্ত তিনটি কমিটিতে টাকা নিয়ে বিতর্কিত, অনুপ্রবেশকারী, বিএনপি পরিবারের লোক, অতীতে ছাত্রলীগের কোনো পদে না থাকাসহ মাদক সেবীদের পদ দেয়ার অভিযোগ রয়েছে সভাপতি তানভীর ইসলাম রাহুল ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম ইমতিয়াজ ইনানের বিরুদ্ধে। এছাড়া ছয় সদস্যের জেলা কমিটির বাকি দুই সহ-সভাপতি ও দুই যুগ্ম সম্পাদকের সঙ্গেও রাহুল-ইনানের বৈরী সম্পর্ক বলে অভিযোগ রয়েছে। এমনকি রাহুল-ইনান পরস্পরের সম্পর্কে বৈরিতা বিদ্যমান বলে জানা গেছে।
 
২০১৮ সালের ৯ জুলাই জেলার বিরামপুর উপজেলা ও বিরামপুর পৌর শাখার কমিটির অনুমোদন দেন রাহুল-ইনান। এই দুই কমিটি দেয়ার ক্ষেত্রে টাকা নিয়ে বিতর্কিতদের পদ দেয়ার অভিযোগ রয়েছে রাহুল-ইনানের বিরুদ্ধে। বিরামপুর উপজেলা শাখার সভাপতি আব্দুর রাজ্জাকের বাবার বিরুদ্ধে গাঁজা চাষের অভিযোগ রয়েছে। আর বিরামপুর পৌর শাখার সভাপতি মো. মোস্তাকিম ইসলামের বিরুদ্ধে ইয়াবা সেবনের অভিযোগ রয়েছে। মোস্তাকিমের ইয়াবা খাওয়ার ছবিও রয়েছে বলে জানান অভিযোগকারীরা।
 
চলতি বছরের ৭ নভেম্বর জেলার ঘোড়াঘাট উপজেলায় আশরাফুল ইসলামকে সভাপতি ও শাহিন মণ্ডলকে সাধারণ সম্পাদক করে এক বছরের জন্য কমিটির অনুমোদন দেন জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক। এই কমিটিতেও টাকা নিয়ে বিতর্কিতদের পদ দেয়ার অভিযোগ উঠছে রাহুল-ইনানের বিরুদ্ধে।
 
অভিযোগকারীদের কাছে রাহুলের অর্থ বাণিজ্যের ফোন আলাপ এবং ইনানের অর্থ লেনদেনের স্ক্রিনশট রয়েছে বলে জানান তারা। মানবকণ্ঠ বিষয়টি যাচাই করে দেখে বিকাশে বেশ কয়েকবার কমিটি দেয়ার পূর্বে অর্থ প্রদান করা হয়েছে এবং সেই সঙ্গে পদ দেয়ার প্রতিশ্রুতিতে দেয়া ফোন আলাপও পাওয়া যায়।
 
ঘোড়াঘাট উপজেলা কমিটির সভাপতি আশরাফুলের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত বয়স, বিভিন্ন মামলার আসামি, অতীতে ছাত্রলীগের কোন পদে না থাকা এবং পৌর আওয়ামী লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক আসাদুজ্জামান ভুট্টুকে হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের যথার্থ প্রমাণ রয়েছে বলে দাবি করেছেন অভিযোগকারীরা।
 
আর সাধারণ সম্পাদক শাহীন মন্ডলের বিরুদ্ধে মাদক সেবন ও মাদক ব্যবসার অভিযোগ রয়েছে। তার বাবা থানা বিএনপির সদস্য এবং সুদের ব্যবসা করেন বলে জানা গেছে। শাহীনের বাবার তেল পাম্প উদ্বোধন করার সময় খালেদা জিয়ার ছবি দিয়ে উদ্বোধন করেছিলেন বলেও স্থানীয়রা জানান।
 
এ ছাড়া ঘোড়াঘাট উপজেলা ছাত্রলীগের ৩নং সহ-সভাপতি শাহীন আলম ঘোড়াঘাট উপজেলার সভাপতি হওয়ার জন্য রাহুলকে টাকা দিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। রাহুলকে বিকাশে টাকা দেয়ার স্ক্রিনশট এবং সরাসরি টাকা দেয়ার ফোন রেকর্ড অভিযোগকারীদের কাছে রয়েছে। এ ছাড়াও সহ-সভাপতি সুজিত কুমার শুভ পদ পাওয়ার জন্য ইনানকে তিন লাখ টাকা দিয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
 
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে দিনাজপুর জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি তানভির ইসলাম রাহুলের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, দিনাজপুর প্রেসক্লাবের সভাপতি তার কাকা হন। তিনি উক্ত প্রতিবেদক ‘অরিজিনাল সাংবাদিক’ কি না জানতে চান এবং স্থানীয় সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলে পরিচয় নিশ্চিত হয়ে পরে কথা বলবেন জানান এবং ২০ মিনিট পর যোগাযোগ করতে বলেন। পরে তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি মুঠোফোনে কথা বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন।
 
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে দিনাজপুর জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক গোলাম ইমতিয়াজ ইনানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি তিনটি কমিটি বাদে বাকি উপজেলাগুলোতে কমিটি দিতে না পারার কথা স্বীকার করেন। এর কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমাদের জেলায় আমাদের কমিটির আগে আহ্বায়ক কমিটি সাড়ে সাত বছর ছিল। দীর্ঘদিন পর আমরা কমিটি পাই। এরপর আমরা সাংগঠনিক কার্যক্রম চালাই। এ ছাড়া গত বছর জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে উপজেলা আওয়ামী লীগ ও আমাদের আসনের এমপির সঙ্গে কথা হয়। নির্বাচনকে সামনে রেখে বিভিন্ন কার্যক্রম ছিল। সব মিলিয়ে জাতীয় নির্বাচনের পর জেলায় সম্মেলন করে উপজেলা গুলোতে কমিটি দেয়ার কথা হয়েছিল।’
 
আর তিনটি কমিটি দেয়ার ক্ষেত্রে অর্থ বাণিজ্যের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযোগ অস্বীকার করেন ইনান। তিনি বলেন, ‘অর্থ বাণিজ্যের কোনো প্রশ্নই আসে না। আমরা উপজেলা আওয়ামী লীগ ও আমাদের আসনের (দিনাজপুর-০৬) এমপি মহোদয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে কমিটি দিয়েছি। এমপি মহোদয় তার নিজ প্যাডে সাইন করে তিনটি কমিটির অনুমোদন দিয়েছেন।’
 
কিন্তু উপজেলা ছাত্রলীগের কমিটি দেয়ার ক্ষেত্রে একটি আসনের এমপি কিভাবে নিজ প্যাডে অনুমোদন প্রদান করেন বা করার এখতিয়ার আছে কিনা, সে সম্পর্কে কিছু জানাননি তিনি। সেই সঙ্গে দিনাজপুরের বাকি আসনগুলোর এমপিদের সাথে আলোচনা করে তাদের অনুমোদন নিয়ে কমিটি দেয়ার কোন চেষ্টাও কেনো করা হয়নি সেটিও স্পষ্ট করে জানাননি ইনান।

খবরটি শেয়ার করুন...

Comments are closed.




© All rights reserved © 2018-20 boguratribune.com
Desing & Developed BY ThemesBazar.Com