একদিন এই বানের থেকেও মুক্তি পাবে দুখী মানুষ

একদিন এই বানের থেকেও মুক্তি পাবে দুখী মানুষ

নাভিদ ইবনে সাজিদ নির্জন

সারিয়াকান্দিতে যমুনা নদীর কাছে আমার শৈশব কেটেছে। যমুনায় যখন বন্যা হয়, দিনে কয়েক হাত পর্যন্ত পানি বাড়ে, আবার সময় মতো তেমনই দ্রুত কমেও যায়। আমাদের মনের ভেতরে, আমাদের শরীরে-শরীরে যে বন্যা; করোনাভাইরাস মহামারীর যে ভয় এখন বয়ে যাচ্ছে, ভেসে যাচ্ছে, বেড়ে যাচ্ছে যমুনায় বানের পানির মতন দ্রুত। জানি, একদিন এটাও কমতে শুরু করবে, শুধু প্রার্থনা এই বিষন্ন দিনগুলো যেন তেমনিভাবে দ্রুত চলে যায়।

কী চায় এই ব্যাধী! আর কত মানুষকে নিঃস্ব করার পর সে শান্ত হবে; কী তার দাবি, মানুষকে মুক্তি দিতে কিসের বিনিময় চাই তার; কোন আবরণ, কোন মনিহার পরালে ভরবে তার মন; তার ভাবগতিক ঠিক বুঝ উঠতে পারছেন না আমাদের সবচেয়ে মেধাবী বিজ্ঞানীরাও। তবে তাঁরা পারবেন;
নতুন পাড়ায় গেলে তার অলিগলি পথ চিনে নিতেও তো সময় লেগে যায়, পাচিলে ঘেরা বাগানের কোন গাছটায় কোন পাখি কখন বসে গান গায়। কিম্বা পাড়ার কোন মেয়েটি লাজুক ভীষণ, কোন মুরব্বির বদমেজাজী, কোন শিশুটি দুষ্ট ভারী, কোন মানুষের দম্ভ বেশী, কোন পড়শি সহজ-সরল। কোন বাড়িতে লেগেই থাকে ঝগড়াঝাটি। বৃস্টি এলে কোন পথে কাদা বেশি, কিম্বা সন্ধ্যায় কোন বাড়ি থেকে ভেসে আসে জুঁই, চামেলীর গন্ধ। জীবন পাড়ার এসবও তো বুঝে নিতে চলে যায় আমাদের আধেক সময়। পুরো পৃথিবীব্যাপী, দেশে দেশে, শহরে শহরে, পাড়ায় পাড়ায় ছেয়ে গেছে যেই ব্যাধী, তাকে বুঝে উঠতে একটু সময় লাগবে আর’কি। তবে বেশিদিন লাগবে বলে আমার মনে হয় না। মানুষেরই কেউ কেউ যদি তার শ্যামল বনের মতো গভীর প্রেমিকার চোখ দেখে মনের গোপন সব কথা বুঝে নেয়ার মতো কঠিন কাজ পারে; তেমন করে ভেবে দেখতে গেলে সে হিসেবের কাছে এসব নস্যি। তেমনিভাবে আমাদের বিজ্ঞানীরাও এই ভাইরাসের আদ্যপান্ত বুঝে উঠতে পারবেন, আবিস্কার করতে পারবেন ভ্যাক্সিন, আরো যাকিছু জানা বাকি, সেসবও বুঝে নিতে পারবেন তাঁরা। আমরাও পেয়ে যাবো এই ভুল জঙ্গল থেকে বেরিয়ে আসার দিকদর্শন, মানচিত্র।

যমুনায় বন্যার কথা বলেছিলাম। যমুনায় পানি বাড়ে, নদী ভাঙে, দিন নাই রাত নাই, ঝড়, ঝাপটা, রোদ, বৃস্টি, এবং পূর্ণিমায় সেই এক খন্ড জমিতে চোখভরা স্বপ্ন নিয়ে কৃষকের চাষাবাদের সব সাধ অপূর্ণ রেখে নদী কেড়ে নেয় সেই সাধের আবাদি জমি। শস্য, বাড়িঘর, সংসার… ক্লান্ত দুপুরে এবং সন্ধ্যায়, রাতে, অথবা ভোরে, অথবা দেয়াল ঘড়িতে সুখ দুখের প্রতিটি সংখ্যায় দয়িতার হাত ধরে পাশে থাকবার কথা দেয়া সেই মানুষটিও মুক্তি পায়না, জননীর শিশুও পায় না দয়া, ভালোবাসা; সে’ও ভেসে যায় বানের জলে।

এই অসুখটাও শূণ্য করে দিচ্ছে দয়িতার হৃদয়, মায়ের বুক, কৃষকের স্বপ্ন…

২৯রমযান এই লেখাটা লেখছি, আজকে সন্ধ্যায় চাঁদ উঠলে কালকে ঈদ, চাঁদ উঠবে কি না জানিনা; আজ সন্ধ্যায় যদি চাঁদ না’ও ওঠে পরশুদিন তো ঈদ হবেই এটা যেমন নিশ্চিত। তেমনিভাবে কালকে আমাদের আনন্দের দিন, সুখের দিন আসবে কি না জানিনা, কিন্তু পরশুদিন যে তা আসবেই এতে কোনো সন্দেহ নেই।

তবুও অনিশ্চয়তা কাটেনা মনের ভেতর থেকে। জানি, অনেকেই ভালো নেই, মনও ভালো নেই, কী করবেন বলুন। আকাশের দিকে তাকিয়ে, শূণ্যের দিকে তাকিয়ে প্রহর গুনে গুনে দেখুন তো এই দীর্ঘ রাত্রি কেটে যায় কি না।

এই দুঃসময় চিরদিন থাকবে না। আর কটা’দিন পর, ভয় কেটে গেলে, দূরত্ব ঘুচে গেলে প্রিয়জনকে বুকে জড়িয়ে রেখে ভালো থাকবেন সবাই। আপনাদের দীর্ঘায়ু ও সুস্বাস্থ্য কামনা করছি। ভালোবাসা নেবেন। ঈদের অগ্রীম শুভেচ্ছা।


নাভিদ ইবনে সাজিদ নির্জন
প্রধান সম্পাদক, বগুড়া ট্রিবিউন

খবরটি শেয়ার করুন...

Comments are closed.




© All rights reserved © 2018-20 boguratribune.com
Desing & Developed BY ThemesBazar.Com