ষড়রিপু – চিত্তরঞ্জন সরকার

ষড়রিপু – চিত্তরঞ্জন সরকার

করোনাকালে মানুষ কত সংকটময় সময় পার করিতেছে। কর্মহীন হইয়া পড়িবার কারণে দেশে দেশে মানুষজন খাবারের অভাবে না খাইয়া মৃত্যবরণ করিতেছে। চারিদিকে শুধুই হাহাকার, মৃত্যুর মিছিল পরিলক্ষিত হইতেছে। মানুষ আজ বড্ড অসহায় করোনা ভাইরাসের কারণে। তদুপরি সমাজ সংসারের কিছু মানুষ এই মহামারীর মধ্যেও তাদের স্বীয় স্বার্থ চরিতার্থ করিবার নিমিত্তে কতইনা অসাধু কর্ম সাধন করিতেছে। চলমান এই অশান্ত পরিবেশে ও সমাজেরই একাংশ চুরি, ডাকাতি, রাহাজানি,সন্ত্রাস, নারী- নির্যাতন, কোমলমতি শিশুদের নিগ্রহের ঘটনা নিরন্তর ঘটিয়া চলিতেছে। মানুষজন তাঁহাদের সুন্দরতম সদাচার সুবৃত্তি গুলোকে বিসর্জন দিতে কার্পণ্য করিতেছে না। আজ তাহারা ষড়রিপু তথা কাম,ক্রোধ,লোভ,মদ,মোহ ও মাৎসর্য দ্বারা কুপথে পরিচালিত হইতেছে।
তাই প্রাসঙ্গিকভাবেই এই প্রবন্ধে ষড়রিপু নিয়ে যৎকিঞ্চিত আলোচনা করিবার প্রয়াস করিলাম। মানুষের কল্যাণে যদি এতটুকুও কাজে লাগে,তবে এই শ্রম সার্থক বলিয়া মানিব।

ষড় মানে ছয় আর রিপু শব্দের অর্থ হইতেছে শত্রু,দুশমন বা বিপক্ষদল। তাহলে ষড়রিপু কথাটির অর্থ দাঁড়াইতেছে ছয়জন চরম শত্রু যাহা মানব জীবনের মহৎ উদ্দেশ্যে গুলোকে মত্ত করীর ন্যায় বিনষ্ট করিয়া দেয়। রিপুর অন্যরকম অর্থও আছে।সেটি হইতেছে প্রবৃত্তি। ইহার মানে হইতেছে স্পৃহা,আকাঙ্ক্ষা,ইচ্ছা বা অভিরুচি। ব্যাপক অর্থে রিপু শব্দটি নিযুক্তি বা ব্যাপৃত হওয়া অর্থে ব্যবহৃত হয়। অর্থাৎ এই সেই ছয় শত্রু যেগুলো আামাদের সুকুমার প্রবৃত্তিগুলোকে চূর্ণ করিয়া ফেলিয়া অসৎ কর্মে ব্যাপৃত করিয়া রাখে।
একজন শত্রুর বিরোধিতা বা দুশমনিই আমরা অনেক ক্ষেত্রে রোধ করিতে পারিনা। তাহার উপর ছয়জনের কুচক্রী ষড়যন্ত্র বা ধ্বংস-মন্ত্রণা !! কি করিয়া আমরা সুরক্ষিত রাখিব নিজেদেরকে!?

ষড়রিপু শত্রুগণকে বিনাশ করিতে হইলে পূর্বেই সেগুলোর নিজ বৈশিষ্ট্য জানা আবশ্যক। তাহলেই কেবল উপর্যুক্ত দুশমন গুলোকে পরাভূত করা সম্ভবপর হইবে।

কাম :
কাম বলিতে সম্ভোগেচ্ছা কে বোঝায়। ইহার কোন শারীরিক আকৃতি নেই বলিয়া ইহা অনঙ্গ বলিয়াও পরিচিত। সমাজ বহির্ভূত কাম বা রতিক্রীড়া মানব কল্যাণের জন্য বিরাট বাঁধা। কামের রহিয়াছে পাঁচটি শরীর বা বাণ যাহা দ্বারা কোন পুরুষ বা রমনীর প্রতি প্রবল কামাসক্তি জাগিয়ে তোলে। সেইগুলো হইতেছে সম্মোহন,উন্মাদন,শোষণ,তাপন এবং স্তম্ভন নামক কামোদ্দীপক তীর বা বাণ। নারী অথবা পুরুষ সু্ন্দর মনোহর রূপের মোহে পড়িয়া পরস্পরের প্রতি আকৃষ্ট হয়। কাম কে অগ্নি বা অনলের সংগে তূলনীয়। কামার্ত ব্যক্তির ভাল- মন্দ বিচার- বুদ্ধি থাকেনা। সংবাদপত্রের শিরোনামে
তাইতো শোভা পায় নিন্দনীয় অবলা নারী- শিশু ধর্ষণ।
কাম দমন সম্ভব হয় ইন্দ্রিয় সংযমের মাধ্যমে। কামের বিপরীত বৃত্তি প্রেম। ইহার অনুশীলনে বিশ্বের সকল লোকজনকে ঈশ্বরের সৃষ্টি বলিয়া শ্রদ্ধাযুক্ত হয় বা থাকে। বহির্মুখী ইন্দ্রিয়গুলোকে সংযমন করিলে এবং সেগুলো কে স্রষ্টার সেবায় নিয়োজিত করিতে পারিলে কামজয় সম্ভব হয়। তখন অন্যের স্ত্রী,কন্যা,ভগিনীর প্রতি আর লোলুপতা আসিবে না। সমাজেও শৃংখলা বিরাজমান থাকিবে।

ক্রোধ :
ক্রোধ শব্দের আভিধানিক অর্থ রোষ বা রাগ। ইংরেজিতে ইহাকে Anger বলে। আগুন যেমন সকল কিছু পুড়িয়া ভষ্ম করিয়া দেয়, ক্রোধ ও তদ্রূপ হানিকারক। তাই তো ক্রোধানল উঠিলে বয়োজেষ্ঠ্যরা সর্বংসহা মাতা বসুমতির দিকে দৃকপাত করিতে বলিতেন। কেননা মাতা ধরিত্রী সংখ্যাহীন অত্যাচারের শিকার হইলেও কোন রকম উচ্চবাচ্য করেননা।
হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলে ক্রোধান্ধ ব্যক্তিবর্গ। ক্রোধের বিপরীত বৃত্তি সহিষ্ণুতা। ক্রোধ উদিত হইলে সহিষ্ণুতার চর্চার মাধ্যমে ইহাকে বশীভূত করা যায়।

লোভ :
ষড়রিপুর তৃতীয় উপাদান হইতেছে লোভ। ইহার অর্থ হইতেছে কামনা বা লিপ্সা। কাম্য সুন্দর কোনো বস্তু পাইবার জন্য প্রবল বাসনা। অপরের মনোহারী দ্রব্যাদি আত্মসাৎ করিবার নিরন্তর প্রবৃত্তি কে লোভ নামে অভিহিত করা হয়। সুশৃঙ্খল সমাজের মাঝে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী এক বিবেকহীন দানব। অন্যের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রাদি অধিকার করিবার প্রবল আসক্তি লোভের সৃষ্টিকারক। লোভের কারণেই প্রতিনিয়ত পরিবারে,সমাজে,রাষ্ট্রে অথবা আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে অহরহ সংঘাতের সৃষ্টি হইতেছে। করোনায় অসংখ্য অসহায় মানুষের মুখের খাবার মানুষ চুরি করিয়া মনুষ্যত্ব কে ধূলিসাৎ কর। তাই সকল ধর্মগ্রন্থের সারকথা ‘লোভ পরিত্যাগ কর’। অন্যের জিনিসপত্রের দিকে দৃকপাত না করিয়া,নিজের থাকা সম্পত্তির উপর সন্তুষ্ট বা আত্মতৃপ্তিই লোভকে পরাহত করিতে পারে। A maxim proverb, ‘Self-contented persons can certainly be happy in the worldly life’. অর্থাৎ আত্মতৃপ্ত ব্যক্তিবর্গই কেবল এই বস্তু জগতে নিশ্চিতভাবে সুখ পাইতে পারে।

মদ :
মদ শব্দের আভিধানিক অর্থ হইতেছে গর্ব, দম্ভ বা অহংকার। মদের আরেকটি অর্থ সুরা। মদিরা বা সুরা পান করিলে মানুষজন মাতাল বা উন্মত্ত হয়। তদ্রূপ মদমত্ত ব্যক্তি ও অহঙ্কারে উন্মত্ত থাকে। সে ধরাকে সরা জ্ঞান করে।তার মধ্যে সর্বদায় উদ্ধতভাব পরিস্ফুটিত হয়। মদান্ধ ব্যক্তি উদ্ধতপনার আবেশে বিবশ থাকে। সে কখনো অন্যের ভাল-মন্দ বিবেচনা করিতেই পারেনা। সে সকল ক্ষেত্রে আত্মকেন্দ্রিক হয়। নিজের গুণগানে ব্যস্ত থাকে। আত্মপ্রচারে বিভোর থাকে। আকাশছোঁয়া তাহার উচ্চাকাঙ্খা যাহা পূরণ করিতে গিয়ে সে তাহার স্বীয় পতন কে অনিবার্য করিয়া তোলে। ‘Plain- living and high- thinking’ অর্থাৎ সরলসিধে জীবন যাপন করিয়া উন্নত সেই স্রষ্টার চিন্তাভাবনা করাই মদের বিপরীতমুখী বৃত্তি।

মোহ :
মোহ দ্বারা অজ্ঞতা,অবিদ্যা,মূর্খতা,মূঢ়তা,নির্বুদ্ধিতা বা ভ্রান্তিকে বুঝানো হয়। মোহ দ্বারা অন্ধ মুগ্ধতাকেও বোঝায়। মোহকে অন্ধকারের সহিত তূলনীয়। কেননা মোহ ঘোরের ব্যক্তি সঙ্গাহীন বা অচৈতন্য অবস্থা প্রাপ্ত হয়।মোহমুগ্ধ ব্যাক্তি মোহাচ্ছন্ন থাকায় তাহার হৃদয় অন্ধকারে নিমজ্জিত থাকে। নিত্যানিত্য বিচারবোধ তাহার মধ্যে না থাকায় তাহার সব সময় ভূলই হইয়া থাকে। মোহান্ধ ব্যাক্তি সঠিক সিদ্ধান্তে কখনই উপনিত হইতে পারেনা। তাই তো জ্ঞানীরা বলিয়াছেন Education makes a Man enlightened. জ্ঞানার্জনের মাধ্যমে মোহ দূর। তখন হৃদয়ে জ্ঞানের আলো জাগ্রত হয়, অজ্ঞানতার নাগপাশ ছিন্ন করিয়া।

মাৎসর্য :
মাৎসর্য দ্বারা ঈর্ষা,হিংসা বা পরশ্রীকাতরতাকে বোঝায়। অপরের উন্নতি বা সৌভাগ্য দেখিতে পাইলে অন্তর্জালা যাহাদিগকে সীমাহীন দগ্ধ করে তাহারাই মূলত মাৎসর্য পরায়ণ। অপরের ভালোত্বে প্রতিহিংসাপরায়ণ হইয়া থাকে। সে সদাই ভাবিতে থাকে ‘আমার কেন উনার তুলনায় বেশি ভাল হইলনা। আমার যখন হইলনা,তখন অন্য কাহারও সেটি পাইবার অধিকার নেই।’ ইহা বলিয়া সে অন্যের ক্ষতি করিতে থাকে। স্ত্রী- পুত্র-পরিজন,ধন- সম্পদ, সম্মান- প্রতিপত্তি সর্বক্ষেত্রে ইহা পরিলক্ষিতহয় বা হইতেছে। কম বেশি সকলেই এই দোষে দুষ্ট। আর তাই অন্যের উত্তরোত্তর উন্নতি দর্শন করিয়া পরস্বাপহারী হইতে ব্যক্তি কোনোমতেই দ্বিধাবোধ করেনা। এই নিকৃষ্টতম দোষের প্রতিষেধক হইতেছে পরহিতৈষণা বা পরোপকারী হওয়া। এই দোষকে পুরোপুরি মন থেকে চিরতরে নির্মূল করা যাইবে পরার্থে, পরকল্যাণসাধনে আত্মনিয়োগ করিবার মাধ্যমে। পরহিতব্রত হৃদয়ে ধারণ করিলে ব্যক্তি অপার ও অসীম ঐশ্বরিক শান্তি লাভ করিতে পারে।

কতদিনই বা আমরা এই নশ্বর পৃথিবীতে জীবন অতিবাহিত করিতে পারিব? কাজেই ষড়রিপু দমন করিয়া আমাদের ষড়গুণ অর্জন করিতে হইবে। অপ্রতিরোধ্য করোনা ভাইরাস আমাদেরকে কঠিন শিক্ষা দিয়া মানুষ হইতে অনুপ্রাণিত করিতেছে যাহাতে আমরা ঈশ্বরাভিমুখী হই।

প্রকৃতপক্ষে দূর্লভ মনুষ্যত্ব তাহারাই অর্জন করিতে পারিয়াছেন অথবা পারিবেন যাহারা দূর্ধর্ষ এবং অপরাজেয় ষড়রিপু গুলোকে ত্যাগ- তিতিক্ষা, দেবত্ব-সাধনা, পরহিত ব্রতের অনুশীলনের মাধ্যমে পরাস্ত করিতে পারিয়াছেন অথবা পারিবেন।

( এই লেখনী সশ্রদ্ধচিত্তে অর্পিত হইলো শ্রী বাদল চন্দ্র দাম মহাশয়ের করকমলে যাহার অনুপ্রেরণায় আজ আমি মহাজাগতিক জ্ঞানলাভ করিবার নিমিত্তে সামান্য তৎপর হইয়াছি।)

খবরটি শেয়ার করুন...

Comments are closed.




© All rights reserved © 2018-20 boguratribune.com
Desing & Developed BY ThemesBazar.Com