আড়ম্বর

Rina Das - রিনা দাস

বউমা তোমায় কিছুই করতে হবে না;তুমি শুধু আমার ঠাকুর পুজোটা ধরে রেখ ওতেই আমি খুশী।আমি এতদিন ধরে এ চিন্তাই করে যাচ্ছিলাম আমার ঠাকুরদেবতার পুজোটা ঠিক ঠিক হবে তো!আমার অবর্তমানে ঠাকুরের এ উপাসনাটা ঠিক রক্ষিত হবে তো?যাক এবার নিশ্চিত হলেম তোমায় পেয়ে আর মনে কোন খেদ রইল না।এখন থেকে মহা আড়ম্বরে দিন কাটাবো।নতুন লোক ঘরে আনার পূর্বে যা হয় কল্পিত কত স্বপ্ন,আশা,আকাঙ্খা নিয়ে অতিথিকে অভ‍্যত্থনা জানান হয়।

মানুষ নতুন কিছু পাওয়ার আনন্দে আত্মহারা পাগলপরা হয়ে যায়।তখন কাছের প্রিয় জিনিসগুলো ধীরে ধীরে ভুলে যেতে থাকে।তখন হিতাহিত জ্ঞান শূন্য হওয়ার উপক্রম হয়;উভয় উভয়কে স্বাচ্ছন্দ্যে গ্রহণ করতে ব‍্যস্ত থাকে।জীবনের কিছু সময় বসন্তের হাওয়া বিরাজ করে কোন প্রেক্ষিতে  প্রতিকূল পরিস্থিতিতে পরতে নারাজ।তখন প্রতিটি পলকে পলকে প্রতীক্ষার প্রহর সানন্দে গুণতে থাকে।প্রত‍্যহিক জীবনে যেন ধূসর মেঘ সড়ে যাওয়ার মত।শুভ কিংবা অশুভ বলে তখন বাধা-বিপত্তি গুলো চোখের সামনে প্রতিফলিত হতে থাকে।কিছু বিচক্ষণ ব‍্যক্তিত্বসম্পন্ন তা অনুধাবন করে কিন্তু বাস্তবতায় সব সত‍্য প্রকাশ করতে প্রস্তুত থাকে না।অদৃষ্টের উপর ভরসা করে বাকী সময়টুকু অচেষ্টায় ছেড়ে দেয়।নিয়তি হয়তো কিছু অঘটনে  ঈগিত করে যা থেকে সর্তকতা অবলম্বনে বড় কোন বিপদ থেকে রক্ষাও হতে পারে।কিন্তু যখন শেষপ্রান্তে পৌঁছায় তখন আর দেখা ছাড়া কিছু করার থাকে না!!

অত:পর মহাধূমধামে কনের  ও বরের  বিয়ের আয়োজন হল।কনে পক্ষে বিয়ের পাকা বন্দোবস্ত হল।ভোর থেকে শুরু হল দধিমঙ্গল গায়ে হলুদের যথারীতি নিয়ম।বিয়ের লগ্ন ঘনিয়ে এল বিয়ের আসরে বরের মুকুট নিয়ে যেতে উদ‍্যত হল ঠিক সে সময়ে এক কোণায় ভাঙ্গা ধরা পড়ল।কেউ হয়তো মনে মনে বলে উঠল এ তো অশনি সংকেত ;না জানি কোন বিপদের মুখে পরতে হয় এই বধূকে।সব বাঁধা উপেক্ষা করে বিয়ের আসর জমাতে এবার সবাই ব‍্যস্ত কাজে।বরকে বরণ করতে কনের মা বরণডালা নিয়ে উপস্থিত ;বেশ “আড়ম্বরে”শুভেচ্ছা বিনিময় হল।ওদিকে বরের বাকী লোকজন ও উপস্থিত বেশ শুভেচ্ছা বিনিময় হল ঠিক সে মুহূর্তে কি এক চিৎকার শোনা গেল।কি খুটিনাটি তত্ত নিয়ে জোর গন্ডগোল বেঁধে গেল।বরের মা কি যেন কিছু অশোভনীয় কথা প্রকাশ করল।কনে পক্ষের লোকজন সবাই স্তম্ভিত!!একি!কি নিয়ে এই অশোভনীয় আচরণ।কনে পক্ষ তো তাই সবাই একটু মৌন হয়েই রইল ঘটনাটিতে।ধীরে ধীরে কনের মা ও ভাই একটি কোণায় গিয়ে কেঁদে ফেলল।কনের মা মনে মনে আস্ফালন করতে লাগলেন কোন ঘরে মেয়েটি যাচ্ছে বড়সড় কোন বিপদের মুখে ফেলে দিলাম না তো মেয়েটাকে।আপাতত এই পরিস্থিতি সামলে নিলেন কনের বড় জামাইবাবু।সবকিছু ভুল বোঝাবুঝি খানিকটা সামলে নিয়ে এবার শুভ কাজটা শুরু করা যাক।ওদিকে কনেও বেশ আঘাত পেয়ে মুখ লুকিয়ে আড়ালে কেঁদে ফেললেন।কেউই প্রস্তুত ছিল না এই শুভ কাজে এত বড় অশোভনীয়  আচরণের।আধোআধো ক্রন্দনে কনের শুভার্শীবাদ সম্পন্ন হল।সবাই এবার ওসব ভুলে নতুন দিকে মোড় ঘোরালেন।কেউ জুসপানে দিকে কেউ পকোড়া খেতে আড়ম্ভ করলেন।এদিকে শুভ লগনের সময় হয়ে এসেছে শুভদৃষ্টির জন‍্য কনেকে আসরে নিয়ে এলো প্রথমে শুভদৃষ্টি সম্পন্ন হল।এরপর মালা বদলের মাধ্যমে  পুরহিত ও নাপিত মন্ত্রোচ্চারণে শুরু করলেন।ওদিকে কনে সম্প্রদান করার জন‍্য কনের প্রিয় পরিজন আসরে মন্ত্রোচ্চারণ শুরু করলেন।কনে ও বর উভয় পক্ষের পুরহিতমশায় প্রজাপতি মত অনুসারে বিবাহের কাজ সম্পন্ন করতে লাগলেন।বেশ আড়ম্বরে সব পরিজনের মিলিত আয়োজনে বৈদিক মতে বিবাহ সম্পন্ন হল।বিয়ের আসরে কনে ও বরের গাঁটছড়া বাঁধানো হল একে অপরকে সারাজীবনের ধারক ও বাহক হয়ে থাকার।বিবাহের মূল মন্ত্র যা স্বামী স্ত্রীর প্রতিজ্ঞা করে থাকে:

“যদেততং হৃদয়ং তব তদস্তু হৃদয়ং মম

যদিদং হৃদয়ং মম,তদস্তু হৃদয়ং তব”

তোমার এই হৃদয় আমার হোক আমার এই হৃদয় তোমার হোক।পূর্ণ রীতি মেনে বিবাহের মত মঙ্গল কাজ ঘটা করে সম্পন্ন হল।সব কিছু মিটে গেল ঠিকই কিন্তু সবার ভেতরে একটু ক্ষত রয়ে গেল।কনের মা বেশ ভেঙ্গে পরেছে কেন জানি ভেতরটা দুরুদুরু কেঁপে ওঠে।আমার আদুরে মেয়েটার না জানি কি কি বিপদে পরে।রাত কেটে গেল বিকেলে কনের বিদায়ের আয়োজন হল জামাইকে মেয়ের সারাজীবনের দায়িত্ব নিতে বলে কনের মা আর স্হির থাকতে পেলেন না খুব জোর কেঁদে ফেললেন।বাকি আত্মীয় পরিজন ও হুহু করে কেঁদে ফেললেন।এ বিদায় যেন কত সম্পর্ক ছেদ পরে পরের ঘরে মেয়েটি চলে যাচ্ছে।সব নিয়ম মেনে কনেকে গাড়িতে তুলে দিলেন কনে শুধু কেঁদে যাচ্ছে।কিছুদূর যাবার পর বর(বিজু)কনের হাতটি শক্ত করে ধরে কাঁধে মাথাটি নিয়ে আস্বস্ত করলেন।কনে ভেবে যাচ্ছে নতুন পরিবেশে কোন  বিপদ না হয়।মনে মনে ঠাকুরকে ডেকে যাচ্ছে;ঠাকুর যেন সব উপর থেকে দেখে যাচ্ছেন।নতুন গৃহে পর্দাপণ হল;কনে(হিমাদ্রী)কে দুধে আলতায় বরণ করলো নিয়ম মেনে।সন্ধ‍্যাে হল কালরাত্রীতে বর কখনো কনের মুখ দর্শন করবে না তাই হল।পরের দিন সকালে বউকে ভাত কাপড় দেবে বর(বিজু)।সেও আয়োজন হল যথারীতি নিয়ম মেনে বউকে ভাত কাপড় দিয়ে বিজু বলল আজ থেকে তোমার ভাত কাপড়ের দায়িত্ব নিলাম বলেই বর (বিজু)লজ্জায় অগ্নিশর্মা হয়ে অন‍্যত্র গমন করলো।প্রথম পর্ব সেরে সবাই এবার বউভাতের বন্দোবস্তে ব‍্যস্ত।বউকে সাজানো হল অনেক লোকের সমাগম হল।কনে(হিমাদ্রীর)বাবার বাড়ির লোকজন ও এলো।সবাই বেশ নৈশভোজে ব‍্যস্ত মহাধূমে বউভাতটা সেরে ফেলল।কনের মাও এসেছিল সবাই বিদায় হল কনের বাড়ির লোকজন তবুও একটু ভীত ভীত মনে!সব আয়োজন মিটে এবার বর কনের বাকী পর্ব ফুলশয‍্যা কনে খুব ভয়ে জড়সড় অচেনা একটি ছেলেকে বিয়ে না জানি তার কি অভ‍্যাস অনাভ‍্যাস মেনে নিতে হয়।সব চিন্তেয় যেন মেয়ের কপালে ভাঁজ পড়ল।যাক যুদ্ধে নামলে যেমনটা হয় ভাল মন্দ দিক বিবেচনা করে সামিল দিতে হয় ঠিক তাই হল।নতুন মানুষ মেনে নিতে আর মানিয়ে নিতে যেমনটা হয় এই পার্থিব জগতে।ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জীবনে বিজু ফিরলো;কর্মব‍্যস্ততা বেড়ে গেল।দায়িত্বটাও বেড়ে গেল ওদিকে হিমাদ্রী প্রথম দিকে সব কিছু দেখতে লাগল।ঠিক বুঝে উঠতে পারছিল না কি করা উচিত কি অনুচিত!কেননা একদম ভিন্ন পরিবেশ ভিন্ন সংসারজীবন কোথায় কি করতে হবে।একটু ইতস্তবোধ ও হল ঠিকই!তৃতীয়দিন বেশ তর্ক হতে লাগল হিমাদ্রী এবার আরো ভয়ে শঙ্কিত হল।এ কোন জায়গায় এলাম ঠাকুর কি “আড়ম্বরে”ফেললে!!ছোট্ট ছোট্ট বিষয় নিয়ে বেশ বড় গন্ডগোল বেঁধে যাচ্ছে এ দেখে বিজু ও হিমাদ্রী বেশ হিমশিমে পরে যাচ্ছে।নতুন নতুন কিছু বিষয়ে নতুন মোড় তৈরী হচ্ছে সব মিলিয়ে পরিস্থিতি জটিল থেকে জটিলতর হচ্ছে।হিমাদ্রী নতুন পরিবেশে কি করবে ঠিক বুঝে উঠতে পাচ্ছে না ও শুধু নীরবে কেঁদে চলে।বিজুও ঠিক কি করে উঠবে বুঝতে পাচ্ছে না।ছোটখাট বিষয়ে কেন এত বিরোধ হচ্ছে ;একি তবে ঘোর অশনি সংকেতের আড়ম্বর!!

(বি:দ্র:প্রিয় পাঠক গল্পের ঘটনায় কোন সাদৃশ্য থাকলে সত‍্যতা খুঁজতে যাবেন না )

খবরটি শেয়ার করুন...

Comments are closed.




© All rights reserved © 2018-20 boguratribune.com
Desing & Developed BY ThemesBazar.Com