“দ্বীধা : অন্তরের দ্বিমুখী চরিত্র” – নাভিদ ইবনে সাজিদ নির্জন

“দ্বীধা : অন্তরের দ্বিমুখী চরিত্র” – নাভিদ ইবনে সাজিদ নির্জন

“তুমি বলো, তুমি বৃষ্টি ভালোবাসো, কিন্তু তার তলে তুমি ছাতা নিয়ে হাঁটো। তুমি বলো, তুমি সূর্য ভালোবাসো, কিন্তু রোদের দিনে তুমি ছায়া খোঁজো। তুমি বলো, তুমি বাতাস বাতাস ভালোবাসো, কিন্তু যখন সে আসে তুমি জানালা বন্ধ করে দাও। তাই আমি ভয় পাই যখন তুমি বলো, তুমি আমাকে ভালোবাসো।”

এই কথাগুলো কেবল কয়েকটি পংক্তি নয়; এগুলো মানুষের মনস্তত্ত্বের এক গভীরতম ও জটিলতম সত্যের প্রকাশ। প্রেম, ভীতি এবং আত্মরক্ষার দেওয়ালের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা এক মানুষের অব্যক্ত আর্তনাদ। সম্পর্ক মানেই তো নিজেকে মেলে দেওয়া, ভালোবাসার উন্মাদনায় সব কিছু সঁপে দেওয়া। কিন্তু যখন কেউ ভালোবাসার দাবি করে অথচ তার প্রতিটি পদক্ষেপে থাকে দূরত্বের সুরক্ষার বন্দোবস্ত, তখন মনে সন্দেহ জাগা স্বাভাবিক।

প্রকৃতির সাথে সম্পর্কের রূপক: অন্তরের দ্বিমুখী চরিত্র

লেখক বা কথক এখানে প্রকৃতির সবচেয়ে সুন্দর তিন দান—বৃষ্টি, রোদ এবং বাতাস—কে উদাহরণ হিসেবে ব্যবহার করেছেন। এই উপাদানগুলো মুক্ত, স্বাধীন এবং স্পর্শকাতর।

  • বৃষ্টির ছাতা: বৃষ্টি ভিজিয়ে দেয়, ধুয়ে দেয় ক্লান্তি। কিন্তু বৃষ্টি ভালোবাসার দাবিদার মানুষটি হাতে ছাতা নিয়ে তবেই পথে নামে। সে বৃষ্টির সৌন্দর্য উপভোগ করতে চায়, কিন্তু তার ফোঁটায় ভিজে যাওয়ার ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত নয়।

  • রোদের ছায়া: সূর্যের আলো উষ্ণতা ও প্রাণের প্রতীক, অথচ রোদের দিনে ছায়া খোঁজা মানে হলো তাপ ও তীব্রতাকে এড়িয়ে চলা। রোদের আলোটুকু ঠিকই কাম্য, কিন্তু তার প্রখরতা বা পোড়ানোর ক্ষমতাটুকু সহ্য করার কোনো ইচ্ছাই তার নেই।

  • বাতাসের জানালা: বাতাস আসে প্রাণের ছোঁয়া নিয়ে, গতি ও সজীবতা নিয়ে। কিন্তু সে যখন সত্যি সত্যি আসে, ঘর তখন জানালা বন্ধ করে নিজেকে আড়াল করে নেয়।

এই রূপকগুলো আমাদের চোখের সামনে তুলে ধরে এক দারুণ মানসিক দ্বন্দ্ব—সবকিছুকে ভালোবাসার ভান, অথচ তার প্রকৃত অভিজ্ঞতা বা পরিণতি থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার নিখুঁত কৌশল।

ভালোবাসার ছদ্মবেশে আত্মরক্ষা

মানুষ কেন এমন করে? এর উত্তর লুকিয়ে আছে মানুষের মনে গভীর সুপ্ত ভয়ের মধ্যে। ভালোবাসার মতো শক্তিশালী অনুভূতি মানুষের জীবনের নিয়ন্ত্রণ কেড়ে নিতে পারে, তাকে করে তুলতে পারে সম্পূর্ণ উন্মুক্ত ও অরক্ষিত। যারা আঘাত পাওয়ার ভয়ে জর্জরিত, তারা ভালোবাসার অবয়বটুকুকে ঠিকই আকড়ে ধরতে চায়, কিন্তু তার গভীরতাকে ছুঁতে ভয় পায়।

  • তারা ভালোবাসার উপভোগ্য অংশটুকু চায়—যেমন সঙ্গ, উষ্ণতা বা মনোযোগ।

  • কিন্তু তারা ভালোবাসার দায়িত্ব, ত্যাগ ও অনিশ্চয়তা থেকে দূরে থাকতে চায়—যা ঠিক ওই বৃষ্টির ভিজে যাওয়া, রোদের পোড়ানো বা বাতাসের ঝাপটার মতো অস্বস্তিকর মনে হতে পারে।

এই আংশিক গ্রহণ এবং পূর্ণ বর্জনের নীতিই সম্পর্কের মধ্যে তৈরি করে এক অদৃশ্য দেওয়াল।

“তাই আমি ভয় পাই…”

সম্পর্কের সবচেয়ে মারত্মক আঘাত আসে সেখান থেকে, যেখান থেকে মানুষ সবচেয়ে বেশি নিরাপত্তার আশা করে। যখন কেউ বলে, “আমি তোমাকে ভালোবাসি,” তখন অপর প্রান্তের মানুষটির মনে এক পরম শান্তির শিহরণ জাগার কথা। কিন্তু যখন দেখা যায় ভালোবাসার মানুষটির স্বভাবই হলো সবকিছুকে শর্তসাপেক্ষে গ্রহণ করা—উপভোগ করা কিন্তু বিপদের ঝুঁকি না নেওয়া—তখন সেই ভালোবাসার ঘোষণাটি ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

কথক ভয় পান কারণ তিনি বোঝেন:

  1. এই ভালোবাসা হয়তো কেবল কথার কথা, অনুভূতির গভীর পর্যন্ত পৌঁছাতে অক্ষম।

  2. যখন জীবনের আসল ঝড় বা রোদ নামবে, তখন এই মানুষটি আর পাশে থাকবে না; সে ঠিকই নিজেকে নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে নেবে।

  3. এই অসম্পূর্ণ প্রতিশ্রুতি একসময় নিঃসঙ্গতার গভীর খাদে ফেলে দিতে পারে।

উপসংহার

ভালোবাসা কোনো ছাতা দিয়ে ঘেরা পথ নয়, রোদের তীব্রতা এড়িয়ে ছায়ায় কাটানো আলস্যও নয়, কিংবা বন্ধ জানালার ওপারে দাঁড়িয়ে বাতাসকে উপভোগ করার অভিনয়ও নয়। ভালোবাসা মানে হলো বৃষ্টির ফোঁটায় সম্পূর্ণ ভিজে যাওয়া, রোদের উষ্ণতায় পুড়তে প্রস্তুত থাকা এবং বাতাসের ঝাপটায় নিজের সমস্ত অস্তিত্বকে মেলে দেওয়া।

তাই শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন থেকেই যায়—যে মানুষটি প্রকৃতির সামান্য উপাদানগুলোকেই নিরাপদ দূরত্বে রেখে ভালোবাসে, সে কি আদৌ অন্য কোনো মানুষকে তার সমস্ত তীব্রতা ও সৌন্দর্যসহ ভালোবাসতে সক্ষম? আর ঠিক এই কারণেই কথকের মনে ভয় জাগে, যে ভয় এক চিরন্তন সতর্কবার্তা।

লেখক: নাভিদ ইবনে সাজিদ নির্জন, প্রধান সম্পাদক, বগুড়া ট্রিবিউন

Share this news...

Comments are closed.




© All rights reserved © 2018-2027 boguratribune.com
Desing & Developed BY ThemesBazar.Com