ডাকাতেরা ইদানিং ডাক্তার হয়ে উঠেছে

ডাকাতেরা ইদানিং ডাক্তার হয়ে উঠেছে

নাভিদ ইবনে সাজিদ নির্জন

যে দেশে একজন খেটে খাওয়া গরীব মানুষ সারাদিন রিক্সা চালিয়ে, কামলা খেটে ৩-৪শ টাকা কামাই করেন, সেই দেশে একজন ডাক্তার ২মিনিট কথা বলে ৫০০টাকা থেকে ২হাজার টাকা পর্যন্ত নেন। নতুন হলে ১৫০০, পুরাতন হলে ১০০০… কতরকম তাদের পলিসি! আমাদের গরীব মানুষেরা নিজেদের জমা-জমি বেঁচে চিকিৎসার বিল পরিশোধ করেন। এইসব ডাকাতি সবচে বেশী হয় বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে, এবং আমাদের সরকারি ডাক্তারেরা সেইসব বেসরকারি হাসপাতালগুলোর ডাকাত বাহিনির সৈন্যদের অন্যতম। ডিএনসিসি’র মাননীয় মেয়র আতিকুল ইসলাম বললেন, বেসরকারি হাসপাতালগুলো ডাকাতের মতো টাকা নেয়। সময় এসেছে, ডাকাত শ্রেণীর এই ডাক্তারদের এবং হাসপাতালগুলোকে সাবধান করতে হবে, ক্লিয়ার মেসেজ দেয়া দরকার, প্রয়োজনে লাইসেন্স বাতিল করতে হবে, আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।

আমি মনে করি, আমাদের ডাক্তাররা আসলে ডাকাত হয়নি। চিকিৎসা সেবা দেয়া একটা মহান পেশা, ডাক্তার কখনোই ডাকাত হতে পারেন না। তবে একজন ডাকাত যদি ডাক্তার হয়ে যায় তখন কী উপায়! আমার তো মনে হয় দেশের অনেক ডাকাত ইদানিং ডাক্তার হয়ে গেছে।

ডাক্তারদের নিয়ে কিছু বলার আগে দশবার ভাবতে হবে, কেননা আমাদের অসুখ-বিসুখ কিছু একটা হলে ডাক্তারের কাছেই যেতে হবে। কিন্তু আতঙ্কটা থেকে যাবার যথেষ্ট কারণ আছে। যোগ্য লোক ডাক্তার হয়েছে কি না। অপারেশন শেষে ইনফেকশন হওয়ার আগপর্যন্ত আমরা তো জানতে পারবো না, ডাক্তার আমাদের পেটের ভেতর গজ ফেলে রেখে সেলাই করে দিয়েছেন কি না। কিম্বা সেই ব্যক্তি পরীখ্ষায় নকল করে চুরি চামারি করে ঘুস ঘাস দিয়ে ডাক্তার হয়েছেন কি না। আমাদের জীবন যার কাছে সঁপে দিচ্ছি সে ভন্ড কি না এটা ভাবার প্রয়োজন এখন সৃষ্টি হয়েছে, যেহেতু দেশের ডাকাতেরা ডাক্তারের খাতায় নাম লিখিয়েছে। কে সত্যিকারের ডাক্তার এবং কে ডাকাত থেকে প্রমোশন পেয়ে ডাক্তার হয়েছে তা বাছাই করা বড় কঠিন কাজ। যদিও তা নাগরিকের ভাববার বিষয় না, এই চিন্তা ভাবনা করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের।

সৃষ্টিকর্তার পর একজন ডাক্তারের হাতে মানুষের জীবন নিহিত থাকে। অযোগ্য পোঁদপাকা লোভী সহিংস শ্রেণীর কাউকে ডাক্তার বানিয়ে রাষ্ট্র তার হাতে নাগরিকের জীবন তুলে দিতে পারে না। একজন জনপ্রতিনিধি যদি ড্রেন নির্মাণে দুর্নীতি করেন সেই ড্রেন ভেঙে নতুন ড্রেন নির্মান করা যায়, একজন ডাক্তার ভুল চিকিৎসা দিয়ে রোগী মেরে ফেললে সেখানে সংশোধনের সুযোগ থাকেনা। প্রতিটি জীবন গুরুত্বপূর্ণ, একটা মানুষ মেরেছে আর মারবে না, থুক্কু বলে নতুন করে খেলা শুরু করবেন, এটা তো তামাশা না। ভেঙে গেছে বাম হাত, ডাক্তার প্লাস্টার করলেন ডান হাতে। কেউ কেউ রোগীর পেটে গজ রেখে সেলাই করে দিচ্ছেন, কেউ সিজারের সময় নবজাতকের পেট কেটে ফেলেন, কেউ কেউ লাশ আইসিইউতে রেখে ব্যাবসা করছেন।

যে দেশে ডাক্তারেরা আচরণে এবং কাজকর্মে ডাকাতের পর্যায়ে পৌঁছে গেছেন, সেই দেশেই আবার কিছু ডাক্তার দরিদ্রদের বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা দেন। নিজের বেতনের টাকা কিনে দেন ওষুধ। কেউ কেউ গরীব রোগীদের থেকে কোনোরকম ফি তো নেনই না বরং নিজের পকেট থেকে টাকা দিয়ে সাহায্য করেন এমন উদার ডাক্তারও আছেন আমাদের দেশেই। করোনা ভাইরাসের মধ্যে নিজের জীবনের কথা না ভেবে দিন রাত এক করে চিকিৎসা দিয়ে গেছেন তাঁরাই। দায়িত্ব পালন করতে যেয়ে অনেক ডাক্তার শহীদ হয়েছেন। করোনা আক্রান্ত রোগীকে স্বজনেরা ফেলে গেছেন কিন্তু ডাক্তাররা ফেলে যাননি এমন মহানুভবতার উদাহরণও আছে।

কিন্তু কথা হল, কোন দেশে কার বেতন কত, কে কত টাকা ফি নেয় তার সাথে আমাদের ফুটানি মারলে চলবে না। এটা বাংলাদেশ, এখানে নর্দমা থেকে পচা খাবার তুলে খায় মানুষ। মাথার চুল বিক্রি করে সন্তানের জন্য দুধ কেনেন মা। নেহাৎ জাতির জনকের কন্যা, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সুযোগ্য নেতৃত্বে প্রতিটি নাগরিকের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের নিশ্চয়তার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে দেশ। এই দেশে আলগা ফুটানি করে জাতির জনকের স্বপ্ন এবং তাঁর কন্যার পরিশ্রম পানিতে ভাসিয়ে দেয়ার দুঃসাহস কেউ দেখালে তার চরম মূল্য দিতে হবে। চিকিৎসা ক্ষেত্র ছাড়াও দেশের প্রতিটি পর্যায়ে প্রতিটি ক্ষেত্র থেকে এইরকম ডাকাতদের ধরে ধরে খোঁয়াড়ে তোলা হবে। এবং তা ইতিমধ্যে শুরুও হয়েছে। আমি স্পষ্টভাবে মনে করি বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ ফি ২০০টাকার উপর  হওয়া উচিত না, বেসরকারি হাসপাতালগুলোর সকল ফি সরকার নির্ধারণ করে দেয়া উচিত এবং এই ফি যেন একজন নিম্ন আয়ের মানুষের পক্ষে জুলুম না হয় সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে।

দেশের নিম্ন আয়ের মানুষদের নিয়ে ভাবতে হবে। আমাদের দিনমজুর, আমাদের কৃষক, শ্রমিকদের নিয়ে ভাবতে হবে। তারাই দেশের চালিকাশক্তি, তারাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। তারা টাকার অভাবে অনেক কিছুতেই সাহস পান না, আমরা তাদেরকে জমিদারি বানিয়ে দিতে বলছি না, আমরা তাদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে বলছি। তাদের কথা বলতে হবে। তাদের সুখ দুখের কথা ভাবতে হবে। আমাদের গরীব মানুষেরা অসুখ হলে সেই অসুখ অসহ্যের চূড়ান্ত পর্যায়ে না যাওয়া পর্যন্ত ডাক্তারের কাছে যান না, তার বড় একটা কারন, ‘টাকা খরচ হবে’। এমনিতেই পেটে ভাত যায় না তার ওপর বারতি খরচ, তারা নিজের জীবনের কথা তুচ্ছ করেন, কারন তাদের টাকা পয়সা খুব সীমিত। আমার নদীভাঙা গ্রাম, বগুড়ার সারিয়াকান্দিতে এমন অনেক গরীব মানুষ আছেন যারা চিকিৎসার বিল দিতে যেয়ে শেষ সম্বল জমা জমি বেঁচে নিঃস্ব হয়েছেন।

রাষ্ট্রকে এই বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে কেননা নাগরিকের স্বাস্থ্য রাষ্ট্রের সম্পদ। চিকিৎসা কোনো বিলাসিতা না, এটা প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার। এই অধিকার কেউ খর্ব করার চেষ্টা করলে তার হাড়ভাঙ্গা জবাব দিতে হবে।

খবরটি শেয়ার করুন...

Comments are closed.




© All rights reserved © 2018-20 boguratribune.com
Desing & Developed BY ThemesBazar.Com