সারিয়াকান্দিতে চন্দনবাইশার নামকরণের ইতিহাস

সারিয়াকান্দিতে চন্দনবাইশার নামকরণের ইতিহাস

যমুনা নদী, চন্দনবাইশা

চন্দনবাইশা বগুড়া জেলার সারিয়াকান্দি থানার যমুনা নদীর অববাহিকায় একটি ইউনিয়ন যা বগুড়া সদর থেকে প্রায় ২৫ কিঃ মিঃ পূর্ব দিকে অবস্থিত। এর নামকরণের ইতিহাস বাংলার প্রাচীন ইতিহাসের সাথে জড়িত। বাংলার প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় প্রায় প্রতিটি জনপদেরই নাম ও ভৌগোলিক সীমা পরিবর্তিত হয়েছে। চন্দনবাইশার ক্ষেত্রেও অনুরূপ ভাগ্যলিপি বহন করতে হয়েছে। প্রাচীন আমল হতে মুসলিম ও জমিদারী শাসন পর্যন্ত চন্দনবাইশা অঞ্চল যেমন কোন এক শাসকের অধীনে থাকেনি; অনুরূপভাবে সমগ্র অঞ্চলটিও একক কোন নাম ধারণ করতে ব্যর্থ হয়। অনেক সময় দেখা গেছে, প্রাচীন জনপদের মধ্যে তার অবস্থান, সীমা ও নাম পরিবর্তিত ও আবর্তিত হয়েছে। ইতিহাসের আলাকে জানা যায়, বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজদ্দৌলাকে ১৭৫৭ সালে পলাশী নামক স্থানে বৃটিশ বেনিয়ারা পরাজিত করে এদেশে তাদের প্রভুত্বের প্রতিষ্ঠা লাভ করে (ডঃ আমজাদ এবং গঃ ১৯৮৪)। শুরু হয় তাদের শাসন ব্যবস্থা। শুরুতেই তাঁদের শাসন ব্যবস্থাকে এদেশে সুদৃঢ় করবার জন্য বড় বড় জেলা ভেঙ্গে তারা ছোট করে ফেলেন। ফলশ্রুতিতে ১৮২১ সালে তৎকালীন দিনাজপুর জেলার বদলগাছি, লালবাজার ও ক্ষেতলাল থানা, রংপুর জেলার দেওয়ানগঞ্জ ও গোবিন্দগঞ্জ থানা, রাজশাহী জেলার আদমদিঘী ও শেরপুর এবং নওখিলা ও বগুড়া থানা নিয়ে বগুড়া জেলা গঠিত হয়। পরবর্তীতে মানস নদী মজে যাওয়ায় ১৮৬৮ সালের ২০শে মার্চ নওখিলা থানা সারিয়াকান্দিতে স্থানান্তরিত হয়। তবে নওখিলার কাছারী বাড়ি তখনও বহাল তবিয়তেই থেকে যায়। নাটোরের দিঘাপতি রায় বসবাসরত রাজা তখন এ কাছারীতেই একজন ম্যানেজার নিযুক্তির মাধ্যমে সব রকম কার্যাদি সম্পন্ন করতেন। শোনা যায় এই দিঘাপতিয়ার রাজা নাকি নাটোর মহারাজার নিম্নমানের কর্মচারী ছিলেন। পরে ভাগ্যগুণে রাণী ভবানী কর্তৃক আশির্বাদ পুষ্ট হইয়া রাজ্য প্রতিষ্ঠা লাভ করেন এবং পরবর্তীতে অত্যন্ত প্রতাপশালী হয়ে উঠেন। দিঘাপতিয়ার রাজা প্রমদানাথ অত্যন্ত প্রজাবৎসল ছিলেন এবং বিভিন্ন জনহিতকর প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করেন। আজকের চন্দনবাইশা তারই অন্যতম একটি কীর্তি। কিন্তু চন্দনবাইশার নামকরণ প্রবীণদের মুখে জানা যায় অন্যভাবে। প্রাচীনকালে আসল চন্দনবাইশার অবস্থান ছিল বর্তমানের যমুনা নদীর অববাহিকার একটি গ্রাম। সে যমুনার উৎস কুচবিহার, আসাম ও জলপাইগুড়ি যেখানে পাহাড়ী এলাকায় জন্মিত প্রচুর গজারী, শাল, সেগুন, মেহগনি ও চন্দন কাঠের গাছ। বর্ষাকালে বন্যার প্রবল চাপে সে উৎসমুখ অঞ্চল থেকে গাছের গুড়ি নদীতে ভেসে আসতো। সে গুড়ি কাঠগুলি সংগ্রহ করে চন্দনবাইশা এলাকায় গড়ে উঠে ব্যবসা কেন্দ্র। আর এখান থেকে কাঠের বাণিজ্য চলে নৌকাযোগে সুদূর সিরাজগঞ্জ, সরিষাবাড়ী ও জামালপুর এলাকায়। তখনকার সময়ে জমিদার ও বড়লোকদের কাছে সৌখিন আসবাবপত্র ছিল প্রধানতঃ সে সব কাঠের তৈরী। আজও তার অতীত স্মৃতি বহন করে চন্দনবাইশা এবং পার্শ্ববর্তী এলাকা জুড়ে ধনী লোকদের বাড়ীতে সেগুন ও মেহগনি কাঠের আসবাবপত্র । আর কাঠের মধ্যে চন্দন কাঠের ব্যবহার ছিল হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে বহুলভাবে। মেয়েদের কপালে চন্দন টিপ দেওয়া ও সবদেহ পুড়ানোর জন্য চন্দন কাঠই ছিল একক ব্যবহার। কথিত আছে ভেসে আসা চন্দন কাঠের নামকরণে প্রথমে এ গ্রামের নাম ছিল “চন্দন ভাইশা” । কিন্তু কালের সভ্যতায় সে চন্দন ভাইশার নাম এক সময়ে চন্দনবাইশাতেই রূপ নিয়েছে। তাই চন্দনবাইশার নামকরণে বলতে হয় : নদীতে চন্দন কাঠ ভেসে এসেছিল তাই চন্দন কাঠের নামেই চন্দন এবং ভাইসা (ভেসে) আসা থেকে বাইশা হলো। এই মিলে চন্দন বাইশা।

তথ্যসূত্র : ইন্টারনেট

খবরটি শেয়ার করুন...

Comments are closed.




© All rights reserved © 2018-20 boguratribune.com
Desing & Developed BY ThemesBazar.Com