বৃষ্টি ও সাহসী পুরুষের জন্য প্রার্থনা – আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ

বৃষ্টি ও সাহসী পুরুষের জন্য প্রার্থনা – আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ

পাখিরা বসতে পারে এমন কোন বৃক্ষ নেই
জোনাকি লুকাতে পারে এমন কোন গুল্ম নেই
সূর্য শীতল হবে এমন কোন নদী নেই
এবং আমার বিচিত্র শব্দাবলী বিবর্ণ
বৈশাখের শিলাপাতে আহত শস্যের মত বিচূর্ণ

যুবকের বুকে ভালবাসার মত আগ্নেয়াস্ত্র
এক টুকরো খামারের জন্য,
মেয়েরা শেফালীর ঝুড়িতে আগুন চেপে ঘুরে বেড়ায়
অথচ ওরা মা হতে পারতো
এবং আমার চিৎকার মাটির নিম্নতম শূন্যতায় —
যে সাহসী সে যুদ্ধে গেছে
যারা যুদ্ধে যায় তারা ফিরে আসে না।

একতাল মাটি
কখনো স্তূপীকৃত কখনো বিক্ষিপ্ত
প্রায় চোখ প্রায় ঠোঁট গোলাপের মত।
যেখানে চোখ ছিল
সেখানে অন্ধ গোলক
যেখানে গান ছিল
সেখানে শূণ্য বৃত্ত
সেখানে গোলাপ ছিল
সেখানে নিঃশ্বাসের অস্থি
যেখানে চরণ ছিল
সেখানে শুকনো পাতা —
শুকনো পাতা ছাড়া কোন ছায়া নেই
শামুকের ধার ছাড়া কোন সঙ্গী নেই
এবং আমি নিঃসঙ্গ ধু ধু।

অথচ আমি বৃক্ষহীন প্রান্তরের কথা বলতে চাই না
যুদ্ধ এবং আগ্নেয়াস্ত্রের কথা বলতে চাই না
বিশীর্ণ নদী কিম্বা রুক্ষ মৃত্তিকার কথা বলতে চাই না
ভাটি অঞ্চলের বিপন্ন কৃষকের কথা বলতে চাই না।
কিন্তু আমি কেমন করে
মরা গাঙে বান আনবো
কৃষকের ঘরে শস্যের দানা তুলে দেবো
যুবকের বুকে ভালবাসার ধন তুলে দেবো
অথবা বর্ণ্যাঢ্য অরণ্য সৃষ্টি করবো?

এ সব কিছুর জন্য সাহস প্রয়োজন
আমার তেমন সাহস নেই।
যে সাহসী সে যুদ্ধে গেছে
যে সন্ত্রস্ত সে বর্ণের অধিকার থেকে বঞ্চিত
এবং আমার বিচিত্র শব্দাবলী বিবর্ণ
বৈশাখের শিলাপাতে আহত শস্যের মত বিচূর্ণ।

আমি প্রার্থনা করেছি
আমি অস্তাচল থেকে উষার লগ্ন অবধি
প্রার্থনা করেছি।
পরিব্রাজক বিদ্যুত আমার বক্ষকে বিদীর্ণ করেছে
আমি প্রার্থনা করেছি।
আমি মন্দ্রিত প্লাবনের মত
অবিরাম প্রার্থনা করেছি

স্থিতধী বৃক্ষের মত
ঊর্ধ্বমুখে প্রার্থনা করেছি
আমি সাহসী পুরুষের জন্য প্রার্থনা করেছি।

বুধের অন্তে এবং মিথুনের আদিতে
বীজ বুনলে যেমন বিফলে যায়
পশ্চিম আকাশে ধনু উঠলে
শস্যের ক্ষেত্র যেমন পুড়ে যায়
ব্যাধের কুটিল চক্রান্তে
সুপুরুষ পাখি যেমন নিহত হয়
আমাদের শস্যের দানা বিনষ্ট
বিস্তীর্ণ প্রান্তর বৃক্ষহীন
ভালবাসার যুবক নিরুদ্দিষ্ট
সাহসী পুরুষ নিহত।

তুমি আসলে
সুবাতাস বইবে
তুমি আসলে
জননীর পুত্ররা দীর্ঘ আয়ু হবে
তুমি আসলে
সাবৎসা গাভীগণ মধুময় হবে
তুমি আসলে
নিষ্পত্র বৃক্ষ মুকুলিত হবে
তুমি আসলে
শস্যের দানা পরিপূর্ণ হবে
তুমি আসলে
সাহসী পুরুষেরা ফিরে আসবে।

বন বিড়াল ডাকলে
কৃষক যেমন কোদালী মেঘের দিকে চেয়ে থাকে
কার্তিকের শালি ধান
যেমন বৃষ্টির জন্য উন্মুখ হয়ে থাকে
আমি তোমার জন্য
অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় ছিলাম।

আমার মা যেমন তাঁর বড় ছেলেকে
শেষবারের মত দেখতে চেয়েছিলেন
আমার মেয়ে যেমন তার মা’য়ের জন্য
চোখের কোণে কান্না ধরে রাখে
আমি তোমার জন্য
সহিষ্ণু প্রতীক্ষায় ছিলাম।

ঘন্টা যদি বছর হয়
কয়েক বছর ধরে
বছর যদি যুগ হয়
বহু যুগ ধরে
লাল মোরগ যেমন সারা জীবন ভোরকে ডাকে
আমাদের সারা জীবন ধরে।

তুমি আসলে আমরা বিজয়ী হতাম
কিন্তু আমরা বিজিত
তুমি আসলে আমরা সুকণ্ঠ হতাম
কিন্তু সংগীত নিষিদ্ধ
তুমি আসলে আমরা ভয়শূন্য হতাম
কিন্তু আমরা সন্ত্রস্ত।

যে সাহসী সে যুদ্ধে গেছে
যে সন্ত্রস্ত সে বর্ণের অধিকার থেকে বঞ্চিত
এবং আমি নিঃসঙ্গ ধু ধু,
শুকনো পাতা ছাড়া কোন ছায়া নেই
শামুকের ধার ছাড়া কোন সঙ্গী নেই —

আমি তোমার জন্য
অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় আছি
আমি তোমার জন্য
সহিষ্ণু প্রতীক্ষায় আছি।
আমি প্রার্থনা করেছি
আমি সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত অবধি
প্রার্থনা করেছি
আমি শিশিরের জলপ্রপাতের মত
নিঃশব্দে প্রার্থনা করেছি
লতা-গুল্মে জোনাকির জন্য প্রার্থনা করেছি
ধানের ক্ষেতে শামুকের জন্য প্রার্থনা করেছি
আমি বর্ণ এবং বৃষ্টির জন্য প্রার্থনা করেছি।

সূর্যোদয় পূর্বক্ষণে
যখন পাখি ডাকে
কিন্তু ঘর ছেড়ে উড়ে যায় না
আমি আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিলাম
তিনটি নীলবর্ণ জ্যোতিরেখার প্রত্যাশায়।

আমাদের বিশুষ্ক ভুমি
তিমির মতন যেন জলে ভেসে ওঠে।

যখন সূর্যাস্তে সব পাখি
ঘরে ফিরে আসে
আকাশের চাঁদ ওঠে তারা ফোটে
আমি নিষ্পলক চোখে তাকিয়ে ছিলাম
কয়েকটি তারার প্রত্যাশায়

আমাদের তৃষ্ণার্ত ভূমি
জননীর শিশু যেন স্তন্য পান করে।

যখন জোয়ারের প্রারম্ভে
নদী এবং সাগর
পরস্পরের সঙ্গে কথা বলে
আমি গভীর বিশ্বাসে কান পেতেছিলাম
উপকূলে শিলাবর্ষণের প্রত্যাশায়

আমাদের চির বন্ধ্যা ভূমি
বৃষ্টির আদরে যেন গর্ভবতী হয়।

আমি প্রার্থনা করেছি
আমি প্রদোষকাল থেকে রক্তিম প্রত্যুষ অবধি
প্রার্থনা করেছি।
আমি সাহসী পুরুষের জন্য প্রার্থনা করেছি
বর্ণ এবং বৃষ্টির জন্য প্রার্থনা করেছি
শস্য এবং গাভীর জন্য প্রার্থনা করেছি
আমি ভূমি এবং কৃষকের জন্য প্রার্থনা করেছি।
আমি পিতামহের স্তোত্রের মত
মঙ্গলের জন্য প্রার্থনা করেছি
পবিত্র কবিতার মত
কল্যাণের জন্য প্রার্থনা করেছি
আমি দিন এবং রাত
শ্রাবণের ধারার মত প্রার্থনা করেছি।

আমাদের ভূমি
প্রভাতের সূর্যাস্তে যেমন রঞ্জিত হয়
ভাদ্রে কার্তিকে যেন বারিসিক্ত হয়
কৃষকেরা কাজ করে কৃষকের গাভী
সুস্থ সবল থাকে নিরাপদে থাকে।
আমাদের বিশুষ্ক ভূমি
তিমির মতন যেন জলে ভেসে ওঠে
আমাদের তৃষ্ণার্ত ভূমি
জননীর শিশু যেন স্তন্য পান করে
আমাদের চিরবন্ধ্যা ভূমি
বৃষ্টির আদরে যেন গর্ভবতী হয়।

খবরটি শেয়ার করুন...

Comments are closed.




© All rights reserved © 2018-20 boguratribune.com
Desing & Developed BY ThemesBazar.Com